এক সময় চিটাগং স্টিল মিলসের চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠত, কারখানাজুড়ে চলত উৎপাদনের ব্যস্ততা। লোকসান আর প্রতিযোগিতার চাপে সেই মিল বন্ধ হয়ে যায় ১৯৯৯ সালে। একই ভূমিতে ২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে কর্ণফুলী রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (কর্ণফুলী ইপিজেড)। দুই দশকের দীর্ঘ এ যাত্রায় ইপিজেডটির রফতানি ছাড়িয়েছে ১৪ বিলিয়ন ডলার। বেপজার উদ্যোগে গতকাল অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় এ তথ্য জানানো হয়।
সভাটি সঞ্চালনা করেন কর্ণফুলী ইপিজেডের অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মো. খালেদ চৌধুরী। এ সময় বিনিয়োগ, রফতানি ও কর্মসংস্থানের চিত্র তুলে ধরেন বেপজার নির্বাহী পরিচালক আনোয়ার পারভেজ ও কর্ণফুলী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক। এছাড়া ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনার কথা জানান বেপজার সদস্য (ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন) মো. তানভীর হোসাইন।
কর্ণফুলী ইপিজেডের তথ্যমতে, ২০০৭ সালের নভেম্বরে পাওলো ফুটওয়্যার (বিডি) লিমিটেডের হাত ধরে প্রথম রফতানি শুরু হয়, যা ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ছিল ৯ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত মোট রফতানি দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ১৫৬ বিলিয়ন ডলারে। পোশাকের পাশাপাশি তাঁবু-ক্যাম্পিং সামগ্রী, বাইসাইকেল, চামড়াজাত পণ্য, ফার্নিচার, ব্যাগ, অন্তর্বাস, ফ্যাশন ও নিরাপত্তা জুতা তৈরি হচ্ছে এখানে।
বর্তমানে ৪০টি প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে, যার মধ্যে ২৯টি শতভাগ বিদেশী, তিনটি যৌথ ও আটটি দেশীয় মালিকানাধীন; আরো পাঁচটি বাস্তবায়নাধীন। চীন, তাইওয়ান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, শ্রীলংকা, জাপান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা ২৫৮টি শিল্পপ্লট ও পাঁচটি স্ট্যান্ডার্ড ফ্যাক্টরি ভবনে বিনিয়োগ করেছেন।
মাত্র ১৭৪ জন শ্রমিক নিয়ে যাত্রা শুরু করা এ ইপিজেডে বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ ও প্রায় এক লাখ মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে, যার ৬০ শতাংশই নারী। শ্রমিকদের জন্য রয়েছে আধুনিক মেডিকেল সেন্টার, ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন ও মাতৃত্বকালীন সহায়তা। ২০১৫ সালে বেপজার দায়িত্বে আসা বেপজা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ছে দেড় হাজার শিক্ষার্থী। এছাড়া ইপিজেডে কর্মরত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের সন্তানদের প্রাক-প্রাথমিক থেকে এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনায় ৫০ শতাংশ বেতন মওকুফ সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
কর্ণফুলী ইপিজেডের প্রতিষ্ঠান কেনপার্ক বাংলাদেশ অ্যাপারেল (প্রা.) লিমিটেডের পরিচালক খলিলুর রহমান মিল্টন বলেন, ‘বেপজার সহায়তাই বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আমাদের সাহস জুগিয়েছে।’ এর ফলে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
ইপিজেডটির নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক বলেন, ‘কর্ণফুলী ইপিজেড কেবল গার্মেন্টসেই সীমাবদ্ধ না থেকে বৈচিত্র্যময় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, যা দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।’
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে চিটাগং স্টিল মিলসের জায়গায় ইপিজেড স্থাপনের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী ও বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্টিল মিলসকে চট্টগ্রাম ইপিজেডের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে পত্র দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্টিল মিলের জমিতে ইপিজেড স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।